কেন বাড়ছে বিয়েবিচ্ছেদ?

বুধবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৭:৩৪ পূর্বাহ্ণ | 107 বার

কেন বাড়ছে বিয়েবিচ্ছেদ?

রাজধানীতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বিয়েবিচ্ছেদের ঘটনা। প্রতিদিন গড়ে বিয়েবিচ্ছেদ ঘটছে ১৫ দম্পতির! পাল্টে গেছে আগের সব পরিসংখ্যান, তালাক দেওয়ার দিক থেকে এগিয়ে আছেন নারীরা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আরাফাত শাহরিয়ার

তালাকপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার নেপথ্যে অনেক বিষয় কাজ করছে। এর মধ্যে বর্তমানে নারীদের স্বাধীনচেতা মনোভাব, সচেতনতা ও উপার্জন সক্ষমতা বেশি কাজ করছে। এসব কারণে নারীরা এখন জীবনের সিদ্ধান্তগুলো সহজেই নিতে পারছেন। এ ছাড়া দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক কলহ, আকাশ সংস্কৃতি, অর্থনীতির কারণেও তালাকপ্রবণতা বেড়ে চলেছে। এসব তালাকের ঘটনায় পারিবারিক জীবনে বেশ প্রভাব পড়ছে

‘আমাদের ভালোবাসার বিয়ে। বিয়ের আগে তিন বছর প্রেম ছিল, তখন চাকরি নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না; কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পরই সে চাকরি ছাড়তে বলে। আমি রাজি না হলে আমার এক কলিগকে জড়িয়ে নানা রকম সন্দেহ ও বাজে মন্তব্য করা শুরু করে, যা আমার জন্য অপমানজনক। সন্দেহের বিষবাষ্পে আমার জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। আমি ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিই।

মা-বাবা বিয়েতে আমার পছন্দ নিয়ে আপত্তি না তুললেও ছাড়াছাড়ির সময় আমাকে অনেক ভেবে নিতে বলেছিলেন। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। ’ বলছিলেন ঢাকার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কর্মরত চিকিৎসক শাফিনা শহিদ। একটা সময় ছিল, যখন স্বামীরা যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ডিভোর্স দিত। স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই একাধিক বিয়ে করত। দিন বদলেছে। এখন তালাক দেওয়ার দিক থেকে এগিয়ে আছেন নারীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাহবুবা জেরিন মনে করেন, নারীরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শিক্ষায়-স্বাবলম্বিতায় অনেক এগিয়ে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়ায় নারীরা এখন আর কোণঠাসা হয়ে থাকতে চায় না। এ কারণেই হয়তো এখন ডিভোর্সের সিদ্ধান্তটা নারীর পক্ষ থেকেই আসে।

বাড়ছে বিয়েবিচ্ছেদ

রাজধানীতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বিয়েবিচ্ছেদ। দুই সিটি করপোরেশনের ১০টি আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে বিয়েবিচ্ছেদের নোটিশ পড়েছে ৩৬ হাজার ৩৭১টি। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৩৫৩টি স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে তালাকের নোটিশ এবং ১২ হাজার ১৮টি স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে তালাকের নোটিশ পড়েছে। এ হিসাবের গড় করলে দেখা যায় প্রতিদিন ১৫টি, মাসে ৪২৯টি এবং বছরে পাঁচ হাজার ১৪৩টি বিয়েবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।

আবেদনকারীর বেশির ভাগই নারী

পাল্টে গেছে আবেদনকারীদের লিঙ্গ পরিচয়। আবেদনকারীর বেশির ভাগই এখন নারী। ডিএনসিসির অঞ্চল-২-এর নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নঈম জানান, উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নারীদের মধ্যে ডিভোর্সের হার বেশি। আর বিচ্ছেদের ঘটনা অনেক বেশি ঘটে বিয়ের এক বছরের মধ্যে।

মগবাজার এলাকার কাজি এ কে এম ফজলুল করিমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে বিয়েবিচ্ছেদ অনেক বেড়েছে এবং ৬৫ ভাগই আসে নারীদের পক্ষ থেকে। প্রতি মাসে তাঁদের অফিসে ১৫-২০ জন আসেন ডিভোর্স করতে, যাঁদের ১২-১৪ জনই নারী। যৌতুক, শারীরিক নির্যাতন, বনিবনার অভাব, ভরণ-পোষণ না দেওয়া, দীর্ঘদিন নিখোঁজ, দ্বিতীয় বিয়ে, পরনারী আসক্তি ও অন্যান্য কারণে তাঁরা ডিভোর্সে ইচ্ছুক।

কেন এই বিচ্ছেদ?

কয়েক বছর আগেও বিয়েবিচ্ছেদের উদ্যোগ পুরুষের দিক থেকে বেশি আসত। কেন পাল্টে গেল পরিসংখ্যান? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম মনে করেন, তালাকপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার নেপথ্যে অনেক বিষয় কাজ করছে। এর মধ্যে বর্তমানে নারীদের স্বাধীনচেতা মনোভাব, সচেতনতা ও উপার্জন সক্ষমতা বেশি কাজ করছে। এসব কারণে নারীরা এখন জীবনের সিদ্ধান্তগুলো সহজেই নিতে পারছেন। তিনি আরো জানান, দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক কলহ, সংস্কৃতি, আকাশ সংস্কৃতি, অর্থনীতির কারণেও তালাকপ্রবণতা বেড়ে চলেছে। এসব তালাকের ঘটনায় পারিবারিক জীবনে বেশ প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে নারী নেত্রীরা মনে করছেন, নারীরা এখন শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, আত্মমর্যাদা ও নির্ভরশীলতায় এগিয়ে যাচ্ছেন। ফলে এসব তাঁদের মধ্যে এক ধরনের সাহসিকতা তৈরি করছে। তাঁরা এখন আর অপমান বা নির্যাতনের গ্লানি সহ্য করছেন না। তাই ছাড়াছাড়ির সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

দায়টা কার?

ঢাকা ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রী সুমাইয়া শারমিন মনে করেন, বিয়ের মধ্য দিয়ে একটি নতুন জীবনের সূচনা হয়। সেখানে অনেক নতুন বিষয় সামনে আসে। কারো ভুল হলে তা বুঝিয়ে বলা এবং একে অন্যকে সহযোগিতা করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, উভয়েরই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকে না। ফলে দ্বন্দ্ব বাড়ছে, যার পরিণাম বিয়েবিচ্ছেদ। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক মোহসিনা হোসাইন মনে করেন, শিক্ষা অর্জনের ফলে নারীর চিন্তা ও মননের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও বাড়ছে। যে নারী ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বে আপসে রাজি থাকে না, তাঁকে ভেঙে ফেলতে হয় স্বপ্ন দিয়ে গড়া ভালোবাসার নীড়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সংসার বিনষ্টের জন্য নারীকেই দোষারোপ করে; কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর জন্য পুরুষরাই দায়ী থাকে।

সমাধান কী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের মতো এখনো অনেক নারী গৃহনির্যাতনের শিকার। এখনো যৌতুকের বলি হন অনেকে। তবে মেয়েরা এখন অনেক বেশি শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী। তাই এ সমস্যাটা দিন দিন কমে আসছে। সমাজ থেকে এ সমস্যা একেবারেই দূর হওয়া দরকার। ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব ও বনিবনার অভাব অনেক ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেকে অর্থনৈতিক দিক থেকে পরিবারে স্বামীর সমান অবদান রাখছেন। তার ওপর ঘরের কাজ, রান্নাবান্না ও সন্তান পালনের দিকটাও তাঁকে দেখতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পুরুষের সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা কাম্য। পারস্পরিক সম্মানবোধ তৈরি ও সংবেদনশীলতা আনয়নও জরুরি। একেবারেই নিরুপায় না হলে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ডালিয়া পারভীন। তিনি বলেন, ডিভোর্স সমস্যার সমাধান নয়। এটা আপাত সমাধান এনে দিলেও মঙ্গলকর কিছু বয়ে আনে না। সমঝোতা ও ছাড় দেওয়ার মাধ্যমেই সম্পর্ক স্থায়ী করা উচিত। কোনো ভাঙন কখনো ভালো ফল বয়ে আনে না।-কালের কন্ঠ

zahidit

Development by: zahidit.com

Select language »