প্রাথমিক শিক্ষকদের সম্মানী বৃদ্ধি বনাম গণদাবি

মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ | ১২:৩৯ অপরাহ্ণ | 402 বার

প্রাথমিক শিক্ষকদের সম্মানী বৃদ্ধি বনাম গণদাবি
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের“টিচার পেই অ্যারাউনড দ্য ওর্য়াল্ড”প্রবন্ধে বলা হয়েছে–‘আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থা আজকের শিক্ষার্থীকে আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত করে।’’
ওই প্রবন্ধটির মন্তব্য যে যথার্থ,তা আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক দিক বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে।আমেরিকা শুধু মুখে এমন কথা বলেছে,তা নয়;কাজেও প্রমাণ করেছে যে,তারাই সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীদের উৎপাদনমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
শিক্ষার মানের ক্ষেত্রেও ওই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজও বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হওয়াতে সম্প্রতি আমেরিকার অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও সারাবিশ্বের মেধাবী শিক্ষার্থীদের ওই দেশে শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ আগের মতোই রয়ে গেছে।
আমেরিকা কীভাবে বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে সে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে,তারা প্রায় সব পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার মতো প্রাথমিক শিক্ষাতেও গুরুত্ব দিয়েছে।প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চ বেতন ও মর্যাদা নিশ্চিত করেছে।ওইসিডি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী,আমেরিকায় একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পেশায় নিযুক্ত হন ৩৭,৫৯৫ ডলার বেতনে।১৫ বছর চাকরি করার পর ওই শিক্ষকের বেতন হয় ৪৬,১৩০ ডলার।তিনি সর্বোচ্চ ৫৩,১৮০ ডলার বেতন পেতে পারেন।
দ্য ইউনাইটেড স্টেইট ব্যুরো অব লেবার স্টেইটিসটিক (বিএলএস) এর ভাষ্য মতে,‘আমেরিকাতে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বার্ষিক বেতন ৫৬,১৩০ ডলার।’
আমেরিকার মাথাপিছু আয় ও বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের বিরাট পার্থক্য থাকায় আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতনের তুলনা যৌক্তিক নয়,একথা ঠিক।তবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে চাইলে আমেরিকার মতো আমাদেরও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা জরুরি।
প্রতিবেশি দেশ ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশই শিক্ষকদের বেতন প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে বহুগুণ এগিয়ে রয়েছে।উইকি অ্যানসার ডটকমের মতে,‘‘ভারতে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসে বিশ হাজার রুপি সম্মানী পান।’’ভারতের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন,ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে,‘সব কিছু মিলে মাসে তাদের মাথাপিছু সম্মানী দাঁড়ায় ২৬,২৯২ রুপি।’
সেখানে বাংলাদেশের একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বেতন ৬ হাজার ৪০০ টাকা (গ্রেড: ১১) ও প্রশিক্ষণবিহীনরা ৫ হাজার ৯০০ টাকা (গ্রেড: ১২) বেতন পান।অন্যদিকে,প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকের বেতন ৫ হাজার ২০০ টাকা (গ্রেড: ১৪) এবং প্রশিক্ষণ নেই এমন সহকারী শিক্ষকরা ৪ হাজার ৯০০ টাকা (গ্রেড: ১৫) বেতনে শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন।
[তথ্যসূত্র:বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম,৯ মার্চ,২০১৪]
যদিও এই নতুন বেতন কাঠামোর স্বাদ বেশিদিন আগে তাদের ভাগ্যে জোটেনি।প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আদেশের প্রেক্ষিতে গত ৯ মার্চ থেকে তারা ওই সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।তাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামই এই নতুন সম্মানী ঘোষণা করতে সরকার বাধ্য হয়েছে।
তবে এই নামকাওয়াস্তে বেতন বৃদ্ধি শিক্ষকদের জীবন-মান পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়।নতুন পে-স্কেল ঘোষণার কয়েক দিন যেতে না যেতেই তারা আনন্দে পরস্পর মিষ্টি মুখ না করিয়ে বাস্তবতাই তাদেরকে আবারও আন্দোলন করতে বাধ্য করেছে।তাদের এই রাজপথের আন্দোলন বলে দিচ্ছে যে,নতুন ঘোষিত বেতন কাঠামোতে তারা সন্তুষ্ট নন।
সরকারের তরফ থেকে প্রাথমিক শিক্ষকদের যে সম্মানী বৃদ্ধি করা হয়েছে তাতে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে।নতুন বেতন কাঠামোতে সহকারী শিক্ষকদের সব্বোর্চ ৩০০ টাকা সম্মানী বেড়েছে।তাদের পদমর্যাদাও তৃতীয় শ্রেণির ধাপ অতিক্রম করেনি।প্রধান শিক্ষকদের সম্মানী সব্বোর্চ মাত্র ৯০০ টাকা বাড়লেও তারা অনেকটা খুশি,কারণ তাদের পদমর্যাদা তো বেড়েছে,তারা এখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে।কিন্তু সহকারী শিক্ষকরা যে তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই রয়ে গেছেন,তাদের তৃতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।
বেচনা করলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পুনঃর্বিবেচনা করার দাবি আজ গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।প্ররায় সাড়ে তিন লাখ সহকারী শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি প্রায় সমসংখ্যক পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট দূর করবে।
আর সহকারী শিক্ষকদের তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করার দাবিও অযৌক্তিক নয়।একজন প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী শিক্ষকের মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না।তাই দুটি পদের মধ্যে কিছু বেতনের পার্থক্য রেখে উভয় শ্রেণিকেই দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা প্রদান করা যেতে পারে।
জাতিসংঘের ইউনেসকো ও আইএলও’র যৌথ উদ্যোগে ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে “রেক্যামান্ডডেশন কনর্সানিং দ্য স্ট্যাটাস অব টিচারস”প্রবন্ধে বলা হয়েছে–‘‘প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা মানুষের সব পর্যায়ে ব্যক্তিত্ব বিকাশে সরাসরি ভূমিকা রাখে।’’
মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে সদ্যস্বাধীন দেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণ দিতে যেয়ে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন–“রাষ্ট্রের জাতিগঠনে প্রাথমিক শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।সন্তানের পিতাই কেবল একক পিতৃত্বের দাবিদার হতে পারেন না।একটি শিশুকে যিনি প্রাথমিক জ্ঞান,শিক্ষা দিয়ে মানুষ করে তোলেন তাঁর দান কোনো অংশেই কম নয়।”
[দৈনিক ইত্তেফাক,১৫ মে,১৯৭২;উদ্ধৃত: শারমিন আহমদ,‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’,ঐতিহ্য,২০১৪;পৃ.১৪৬]
প্যারিস সম্মেলনে পঠিত প্রবন্ধ ও তাজউদ্দীন আহমদের বক্তব্যে প্রায় একই বাঁশির সুর বেজেছে।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য,স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পরও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কিত দর্শনের বাস্তব রূপ আজও অধরা থেকে গেছে।আমরা এখনও প্রাথমিক শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে পারেনি। প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কাঠামো সম্পর্কেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
আমেরিকা,ইউরোপ,ভারতসহ প্রায় প্রতিটি দেশ তাদের প্রাথমিক শিক্ষা যুগোপযোগী করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।এ ক্ষেত্রে তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চ বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ওই পেশায় নিযুক্ত হতে উৎসাহিত করছে।
সত্যিকার অর্থে একজন উচ্চমানের কারিগরের পক্ষেই একটি উচ্চমানের শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।একজন মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা প্রদান করতে পারেন।আর মেধাবী শিক্ষার্থীরা তখনই শিক্ষকতায় আসবেন,বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আগ্রহী হবেন,যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চপর্যায়ের সম্মান ও সম্মানী প্রদান করা হবে।উন্নত রাষ্ট্রগুলো বিষয়টি বহু আগে উপলব্ধি করেছে বলেই,তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের থেকে বহু এগিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজম্মকে আমেরিকা বা ইউরোপের মতো উৎপাদনমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চাইলে এখনই সরকারকে প্রতিবেশি দেশ ভারতসহ শিক্ষায় অগ্রগামী দেশগুলোকে অনুসরণ করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে।
আগামী বাজেটে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মানী প্রদানের স্বার্থে পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রদানের মাধ্যমে এর শুভ সূচনা হতে পারে।
আবুসালেহ সেকেন্দার:শিক্ষক,ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
সংগ্রহে: সোনিয়া শারমিন,শিক্ষক,যশোর।

zahidit

Development by: zahidit.com

Select language »