Latest news

মাতৃস্নেহে পাঠদানের কাছে শিক্ষিকার মাতৃস্নেহ অসহায়…..সোনিয়া শারমিন

রবিবার, ০১ জুলাই ২০১৮ | ৭:৩২ অপরাহ্ণ | 429 বার

মাতৃস্নেহে পাঠদানের কাছে শিক্ষিকার মাতৃস্নেহ অসহায়…..সোনিয়া শারমিন
বাংলাদেশে ৩৩%  মাত্র কর্মজীবী নারী-জনসংখ্যার অর্ধেক নারীর অবস্থান উন্নয়নের জন্য সহায়ক নয়। ‘কর্মজীবী নারী’— সংজ্ঞা এবং কর্মজীবী নারীর জন্য— দেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ বিশ্লেষণ গবেষকরা করছেন। আমি নিজ দৃষ্টিকোণে দেখতে চাইলাম— প্রায় দীর্ঘ ৩০ বছরের কর্মজীবনের আলোকে। দেশের সংবিধানসহ বহু আইন, বিধি, নির্দেশনা সরকারি আদেশের পাশাপাশি বাঙালি লালিত ঐশ্বর্যময় সামাজিক পারিবারিক কৃষ্টি ‘নারীকে’ সমৃদ্ধ রেখেছে। আমার ভাষা ‘মায়ের ভাষা’ আমার দেশ দেশমাতৃকা বহু বিশেষণে নারীকে নিয়ে বহমান বাংলাদেশ প্রতিদিন। ‘মা দিবস’ বা নারী দিবস— উপনিবেশকারী ব্যবসায়ী মননের পৃষ্ঠপোষকদের ‘সীমাবদ্ধ’ দৃষ্টিকোণ মনে হলেও— ‘আকাশ সীমাহীন’— এ কারণে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সীমান্তরেখা অতিক্রম করে সব নারীকে একটি এককে আনার সাফল্য হিসেবে দিবসগুলোর গুরুত্ব অনুভব করি। ‘কর্মজীবী নারী’-এর সংজ্ঞা- পরিসংখ্যান গ্রহণে যে উপাত্ত সংগ্রহের প্রক্রিয়া বা পরিসীমার সূচক কী বোঝার চেষ্টা করি।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৩ কোটা বিভাজন সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদগুলো ৬০% মহিলা প্রার্থীদের জন্য পূরণ করার উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি মহিলা প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট বা সমমানের পরীক্ষার ন্যূনতম দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রকৃতির শিক্ষা ও আশীর্বাদে নারীর স্বকীয়তা, ধৈর্য, মমতা ও পরিচর্যার সহজাত ব্যক্তিত্ব প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনে অবস্থান করার সুযোগ বাংলাদেশকে প্রতিদিন আলোকিত পথে নিয়ে যাবে। যদিও বাস্তবতার অনেক সীমাবদ্ধতা উপসর্গ আছে।

“একজন প্রাথমিক শিক্ষিকা মাতৃস্নেহে পাঠদান করতে কতটা ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়,কত কান্না নিরবে সাগরে মিলিত হয়;অনুধাবন করেছে কি,কখনো কেও..!!”

কেস স্টাডি -১ : কোহিনুর বানু। প্রধান শিক্ষিকা। সেলিনা আক্তার তার সহকারি । কোলে ১ বছরের শিশু সন্তান। বাসায় দেখার কেউ না থাকায় তাকে বাধ্য হয়ে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে হয়। একটা কাজের মেয়ের জন্য অনেক চেষ্টা করেও তিনি বিফল হন। সময় হয়েছে ক্লাসে যেতে হবে। কোহিনুর বানু নিজেই খুশি মনে সেলিনা ম্যাম এর শিশুটি কোলে নিলেন তার পর বললেন,ক্লাস করে আসতে। এভাবেই চলছে বিদ্যালয়টি । সকল সহকারিই হেডম্যামকে তার এ সহযোগীতার জন্য ভালবাসেন। বিদ্যালয়ের ফলাফলও ভাল। প্রধান শিক্ষিকা কোহিনুর বানুর ভাষ্য- আমরা যদি বিদ্যালয়ের পাঁচশত শিশুকে দেখাশুনা করতে পারি তাহলে নিজেরটা দেখতে পারবোনা কেনো ?
কেস স্টাডি – ২: শারমিন আক্তার। সহকারি শিক্ষিকা। সংসার ধর্ম পালন করে কোলের সন্তানটি নিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছতে তাকে ২টি গাড়ি পাল্টাতে হয়। ঠিক সময়ে গাড়ী না পাওয়ায় মাঝে মাঝে একটু লেট হয়। কিন্তু প্রধান শিক্ষক আব্দুল বারী চান যথাসময়ে সকল শিক্ষক ক্লাসে উপস্থিত হবেন। তাই শারমিনকে এ বিষয়ে বহু বার সংকেত দিয়েছেন। শারমিনও চেষ্টা করেছেন, বিদ্যালয়ের আশে পাশে একটি ভাড়া বাসা নিয়ে থাকার। কিন্তু গ্রামে কার জন্য কে বাসা বানাবে ? একদিন যখন স্কুলে পৌছালেন তখন সবেমাত্র ক্লাস শুরু হয়েছে। সহকারি শিক্ষা অফিসার নাজমূল হোসেন এলেন বিদ্যালয় পরিদর্শনে। শারমিন ভাবলেন আজ বুঝি চাকুরী শেষ ! এর আগেই প্রধান শিক্ষক তাকে নিয়ে সমস্যার কথা এটিও সাহেবকে শুনিয়ে কানভারী করলেন। শারমিনকে দেখে রাশভারী কন্ঠে বলেন, আসলেন দেরি করে সাথে কোলের সন্তান! এভাবে চাকুরী করতে পারবেন ? কাল থেকে সন্তান নিয়ে আর স্কুলে আসবেন না। এটিও সাহেবের এ কথা শুনে , কেঁদে ফেললেন শারমিন। পরদিন ডাক্তার থেকে সনদ নিয়ে তিন মাসের চিকিৎসা ছুটি নিলেন। সংকটে পড়লেন প্রধান শিক্ষক আব্দুল বারী। আগে একটু লেট হলেও ক্লাস চলতো। এখন শারমিনের ক্লাস নিয়ে পড়লেন বেকায়দায়! তার ক্লাসগুলো গ্যাপ যাচ্ছে। অন্য সহকারিরাও অতিরিক্ত ক্লাস করতে চাননা। কারণ কারও গ্যাপ তেমন নেই। এখন নিজেকেই সব টানতে হচ্ছে !!

প্রাথমিকের অধিকাংশই মহিলা শিক্ষিকা। বর্তমান সময়ে অনেক উচ্চ শিক্ষিত মেধাবী মেয়েই প্রাথমিক শিক্ষকতায় আসছেন। কিন্তু বিভিন্ন সংকটের কারণে তারা চাকুরী জীবনটাকে আনন্দময় করতে পারছেন না। নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও লাইফ স্টাইল সমৃদ্ধ করতে গিয়ে চাকুরীটাই নিজেদের কাছে একসময় উদ্বেগ , উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাড়ায়। স্বামী, সংসার, সন্তান তারপর চাকুরী। একজন নারীকে এ তিনটা বিষয় ম্যানেজ করে তারপর স্কুল বা চাকূরী করতে হয়। সেখানে যারা কৌশলে ম্যানেজ করতে জানেন,তারাই একসময় টিকে থাকেন। বাকীরা সংকটে ঘুরপাক খান। অনেকেই অসহযোগীতার অভাবে চাকূরী ছেড়ে দেন।

অনেকে বলেছেন, মেয়েদের চাকূরীর দরকার কি ? তারাতো স্বামীর টাকা নিয়ে চলেন। যারা এসব কথা বলেন , আমি মনে করি তারা মানসিকভাবে অসুস্থ , অনুদার । কিন্তু দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে মহিলাদের অংশ গ্রহণ জরুরী। আমি পুরুষদের বলছি, একজন কর্মজীবি নারীকে নিজের আপন বোন মনে করে চিন্তা করে দেখুনতো, মনে করুন , আপনার শিক্ষিত বোনের বিয়ে হলে । নিজের যোগ্যতায় প্রাইমারীতে শিক্ষকতার একটি চাকুরী পেলেন। ২টি সন্তান রেখে এক গাড়ী দূর্ঘটনায় মারা গেলেন আপনার ভগ্নিপতি! কিন্তু আপনার কোন চিন্তা নেই। কারণ আপনি গরীব হলেও বোন ২ বেলা খাবারের জন্য আপনার বাড়ীতে বোঝা হয়ে ফিরে আসবে না। কারণ আপনি নিশ্চিত বোনের চাকূরী আছে। তিনি একজন শিক্ষক। সন্তানদেরও তিনি উপযুক্তভাবে মানুষ করতে পারবেন।
তর্কে তর্ক বাড়ে। বাংলাদেশের প্রাইমারীতে যারা কর্মজীবি নারী রয়েছেন তাদের মধ্যে যে সমস্যাগুলো বেশি দেখা যায় তা হলো –

সন্তানের নিরাপত্তার অভাববোধের কারণে বিদ্যালয়ে সন্তান নিয়ে আসা।
বিদ্যালয় প্রধান বা কমিটির সদস্য বা শিক্ষা অফিসার কর্তৃক সন্তান নিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে নিষেধ করা।
নিজের মতো পোস্টিং না পাওয়া।
বিদ্যালয়ের দুরত্বগত সমস্যা।
পরিবার কর্তৃক অসহযোগীতা।

পরিবারের অসহযোগীতার বিষয়ে বলা যায়, পূর্বে চাকূরী ছিল। বিয়ের পর স্বামী চান চাকুরী ছেড়ে দিয়ে তাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকুক। বছর বছর সন্তানের মা হোক। বাবা-মার সেবা করুক। আবার অনেকে আছেন, চাকূরী করেন কিন্তু ব্যাংকে গিয়ে টাকা তুলতে পারেন না। কারণ চেক বইয়ের সব চেক স্বাক্ষর স্বামী আগেই নিয়েই রখেছেন। এ রকম স্বামীরা মনে করেন তার আবার টাকার কি দরকার ? আমিতো তাকে সব দিচ্ছি! তা আমার একাউন্টেই জমা থাক। অনেকে আছেন এ নিয়ে মারধরও করেন। এ চাকূরীর টাকা নিয়ে অনেকের সংসার ও ভেঙ্গেছে। কারণ অর্কমন্য স্বামী যখন বউয়ের টাকায় অনুমতি আর সমযোতা ছাড়া গায়ের জোরে দখল নিতে চায় তখন তার সাথে কিভাবে জিন্দেগী কাটা যায়? তার চাইতে একলা থাকাই ভালো।

সমস্যাতো অনেক সমাধান কোথায় …..?

সমস্যা থাকলে সমাধানও আছে। রোগ থাকলে যেমন চিকিৎসা আছে,তবে আজকের বিষয়টি আলোচনা সমালোচনা শেষে পাঠকের মতামতের ভিত্তিতে আগামীদিন সমাধানের পথ খুজব এবং সে লেখা প্রকাশ করবো।আমাদের সাথেই থাকুন……

ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে আপডেট জানুন।https://web.facebook.com/shiksharalo.official/?ref=bookmarks

 

লেখক:  সোনিয়া শারমিন মিলি

সহকারি শিক্ষক ও কলামিষ্ট, চৌগাছা,যশোর।

জনপ্রতিনিধি হিসেবে এক অনন্য নজির স্থাপনে এগিয়ে যাচ্ছেন সাংবাদিক আব্দুল বাছিত বাচ্চু

zahidit

Development by: zahidit.com

Select language »