শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতা ।। শিক্ষার আলো

বুধবার, ০১ নভেম্বর ২০১৭ | ২:১৬ অপরাহ্ণ | 103 বার

শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতা ।। শিক্ষার আলো

সম্প্রতি বেসরকারি শিক্ষকদের কেউ কেউ একে অপরের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছেন। জাতীয়করণ ইস্যুতে যেখানে সব শিক্ষক একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা প্রয়োজন, সেখানে তারা করছেন ঠিক উল্টোটা। মনে রাখা উচিত, ফেসবুক এমন একটি মাধ্যম, যাতে পোস্ট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ যখন শিক্ষকদের একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ করতে দেখেন, তখন কিছু শিক্ষকের এই আচরণে গোটা শিক্ষক সমাজের মানসিকতা কিংবা যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য কিছু অশিক্ষকও আছে, যারা ভুয়া ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে অত্যন্ত সুকৌশলে শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছে। শিক্ষকদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি বেশি লক্ষ্য করা যায় কল্যাণ এবং অবসর বোর্ডের অনিষ্পত্তি ৬৮ হাজার শিক্ষকের আবেদন নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কল্যাণ এবং অবসর ভাতার ৪ শতাংশ চাঁদা বৃদ্ধির গেজেট প্রকাশকে কেন্দ্র করে। যেহেতু আমি কল্যাণ ট্রাস্টের সদস্য সচিব, সেহেতু বিষয়টির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, শিক্ষকদের ৯০ শতাংশ কল্যাণ এবং অবসর বোর্ডের বিধিবিধান সম্পর্কে অবহিত নন। সে জন্য অতি সহজেই শিক্ষকদের বিভ্রান্ত করা যায়। উল্লেখ্য, এক সময় বেসরকারি শিক্ষকরা সারাজীবন চাকরি করে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতেন। তাদের কোনো পেনশন সুবিধা ছিল না। শেষ জীবনে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো ছাতা, জায়নামাজ, তসবি, লাঠি প্রভৃতি। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করার পাশাপাশি বেসরকারি স্কুল শিক্ষকদের জন্য মাসিক ৭৫ টাকা এবং কলেজ শিক্ষকদের জন্য ১০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করেন। তখনই বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে টাকার অভাবে তিনি তা করে যেতে পারেননি। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর কোনো সরকারই জাতীয়করণের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। কল্যাণ ট্রাস্ট আইন অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের টাকা থেকে ২ শতাংশ চাঁদা হিসেবে তাদের কল্যাণ ফান্ডে জমা করা হয়। আইন অনুযায়ী একজন শিক্ষক যত বছর চাকরি করেছেন, অবসরে যাওয়ার পর ১৯৯০ সাল থেকে হিসাব করে তিনি সর্বশেষ স্কেল অনুযায়ী তত মাসের সমপরিমাণ কল্যাণ সুবিধা পাবেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ২০১৫ সালের ৩০ জুন অবসরে গেলে একজন কলেজ কিংবা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ কল্যাণ এবং অবসর সুবিধা পাবেন প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অথচ একদিন পর ১ জুলাই যিনি অবসরে যাবেন, নতুন স্কেলে তিনি পাবেন প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে একজন অধ্যক্ষের বর্তমান বেতন স্কেল ৫০ হাজার টাকা। অথচ ১৯৯০ সালে তিনি যখন চাকরিতে যোগদান করেন, তখন তিনি একজন প্রভাষক ছিলেন। তিনি বেতন পেতেন ৮০ শতাংশ। তখন তিনি একজন প্রভাষক স্কেলে ২ শতাংশ চাঁদা প্রদান করতেন, সেই প্রভাষক এখন অধ্যক্ষ কল্যাণ ট্রাস্ট আইন অনুযায়ী তাকে অধ্যক্ষের ৫০ হাজার টাকা স্কেলে ১৯৯০ সাল থেকে হিসাব করে কল্যাণ সুবিধা দিতে হচ্ছে। অনুরূপভাবে অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের একই নিয়মে সর্বশেষ স্কেলে আর্থিক সুবিধা দিতে হচ্ছে।

অবসর বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে। অবসর সুবিধা বোর্ডে ১৯৮০ সাল থেকে হিসাব করে অবসর সুবিধা প্রদান করতে হয়। অবসর বোর্ডে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৪ শতাংশ চাঁদা কর্তন করা হয়। অবসর বোর্ডে চাঁদা কর্তন শুরু হয় ২০০৫ সাল থেকে। ২০০২ সালে যারা অবসরে গেছেন তারাও ১৯৮০ সাল থেকে হিসাব করে অবসর সুবিধা পাচ্ছেন। অথচ তারা এক টাকাও চাঁদা দেননি। বর্তমানে কল্যাণ ট্রাস্টে ২ শতাংশ চাঁদা হিসাবে প্রতিমাসে জমা হয় প্রায় ১৬ কোটি টাকা। চাহিদা প্রায় ৩৩-৩৪ কোটি টাকা।

অবসর বোর্ডে প্রতিমাসে ৪ শতাংশ চাঁদা হিসাবে জমা হয় ৩২-৩৩ কোটি টাকা। চাহিদা তার প্রায় তিনগুণ বেশি। কল্যাণ ট্রাস্টের আমি দায়িত্ব নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত (২০০৯) ১৮ বছরে কল্যাণ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে প্রায় ২৮৯ কোটি টাকা। আর আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত আট বছরে পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় এক হাজার একশ’ কোটি টাকা। নিষ্পত্তি করা হয়েছে ৭০ হাজার আবেদন। তারপর এখনও প্রায় ২৮ হাজার আবেদন অনিষ্পত্তি অবস্থায় রয়েছে। অবসর বোর্ডে অনিষ্পত্তি অবস্থায় রয়েছে ৪০ হাজার আবেদন। অবসরপ্রাপ্ত অসহায় এই শিক্ষক-কর্মচারীদের ৬৮ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যেই কল্যাণ এবং অবসর বোর্ড কর্তৃপক্ষ সর্বসম্মতিক্রমে চাঁদা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অর্থ সংকটের কারণ :এক. কল্যাণ ট্রাস্ট চালু হওয়ার মাত্র ৬ মাস পর ১৯৯১ সালে কল্যাণ ট্রাস্টের সব কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিএনপি সরকার ১৯৯১-৯৬ ক্ষমতায় ছিল। সেই সময় কল্যাণ ট্রাস্টে শিক্ষক-কর্মচারীদের চাঁদা কাটা বন্ধ ছিল। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কল্যাণ ট্রাস্ট পুনরায় চালু হয়। কল্যাণ ট্রাস্টের চাঁদা আদায় বন্ধ থাকায় ৭ বছরে ফান্ড থেকে প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা কমে যায়।

দুই. কল্যাণ ট্রাস্টের আয়ের আরেকটি উৎস ছিল ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে বার্ষিক পাঁচ টাকা চাঁদা আদায়। ২০০২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ছাত্রছাত্রীদের চাঁদাও বন্ধ করে দেয়। ফলে গত ১৫ বছরে এ খাত থেকে দেড়শ’-পৌনে দুইশ’ কোটি টাকা কমে যায়।

তিন. কল্যাণ ট্রাস্টের আইন অনুযায়ী সর্বশেষ স্কেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ সুবিধা প্রদান করতে হয়। স্কেল পরিবর্তনশীল। বেতন ক্রমশ বাড়তেই থাকে। নব্বইয়ের পর অন্তত পাঁচটি পে স্কেল হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে ঘোষিত অষ্টম পে স্কেলে বেতন বেড়েছে প্রায় ১০০ শতাংশ। ফলে কল্যাণ অবসর বোর্ডে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুবিধাও দিতে হচ্ছে ১০০ শতাংশ বেশি।

২০০৯ সালে জাতীয় বেতন স্কেলে প্রায় ৬২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় কল্যাণ ট্রাস্ট অর্থ সংকটে পড়ে। তখনই তৎকালীন শিক্ষা সচিব মরহুম আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বোর্ডসভায় কল্যাণ ট্রাস্টে ২ শতাংশ চাঁদা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। তখনই আমরা দাবি জানিয়েছিলাম, সরকার থেকেও এই খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ফলে নতুন স্কেলে কল্যাণ ও অবসরের সুবিধা প্রদান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই সংকট মোকাবেলা করার লক্ষ্যে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিব অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এই খাতে অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কল্যাণ ও অবসর বোর্ডের বোর্ডসভায় বোর্ডের সভাপতি শিক্ষা সচিব নিজেই চাঁদা বৃদ্ধির বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং উপস্থিত বোর্ডের সব সদস্য তাতে একমত পোষণ করেন (বোর্ডে প্রতিনিধিত্বশীল সব শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠনের প্রতিনিধি রয়েছে)।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে গত অর্থবছরে শিক্ষক-কর্মচারীদের চাঁদা বৃদ্ধির শর্তে এই খাতে ৬৫০ কোটি এবং বর্তমান অর্থবছরে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়, চাঁদা বৃদ্ধির গেজেট প্রকাশ ছাড়া অর্থ ছাড় করা হবে না। এমতাবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশ করার পর যেসব শিক্ষক সংগঠন বোর্ডসভায় চাঁদা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে একমত হয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ এর বিরোধিতা করেন এবং আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে দেখা যায়। শিক্ষক নেতাদের এই দ্বিমুখী আচরণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় বিব্রত হয় এবং এক পর্যায়ে গেজেট স্থগিত করে।

তিন. উল্লেখ্য, কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ২৭ বছরে কোনো সরকারের পক্ষ থেকে একটি পয়সাও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। অবসর বোর্ডের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে সরকার থেকে এককালীন ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও এরপর কোনো সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

চাঁদা বৃদ্ধির বিষয়টি যদি ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে সকলে মিলে বোর্ডে পুনর্বিবেচনা কিংবা বিকল্প পন্থা বের করা যেত। তা না করে শিক্ষক নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকেন। এ সুযোগে শিক্ষক নামধারী একটি মহল সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের ক্ষেপিয়ে তোলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে। টাকার অভাবে অনিষ্পত্তিকৃত মানবেতর জীবনযাপনকারী ৬৮ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সকলে চাঁদা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু অপপ্রচারটি এমনভাবে করা হলো, যেন সরকার শিক্ষকদের বেতন থেকে টাকা কেটে অন্য খাতে নিয়ে যাচ্ছে।

বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে সারাদেশের শিক্ষক সমাজ অধীর আগ্রহে দিন গুনছে। না চাইতেই তো এই সরকার ২০ শতাংশ মহার্ঘভাতা দিয়েছে। জাতীয় বেতন স্কেলে বেতন দ্বিগুণ বৃদ্ধি, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি, ১৬২৪ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত, বন্ধকৃত টাইম স্কেল চালু, ৮ হাজার সহকারী লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ, ১৪ হাজার হাইস্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ ও স্কেল প্রদান, নজিরবিহীন অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার বেতন বৃদ্ধি তো এ সরকারের আমলেই হয়েছে।

আমরা শিক্ষক, আমাদের প্রতিবাদের ভাষা তো শিক্ষকদের মতোই হওয়া উচিত। আমরা যদি অশিক্ষকসুলভ আচরণ করি, জাতির কাছে তো আমরা ছোট হয়ে যাই।

মো. শাহজাহান আলম সাজু

সদস্য সচিব, শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়

সূত্র: সমকাল,প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০১৭

zahidit

Development by: zahidit.com

Select language »