শনিবার ২০শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

করোনা ও বাস্তবতা

মৃতের সৎকার এবং খাঁচায় বন্দি ভালবাসা

মোহাম্মদ জাহির মিয়া তালুকদার   |   মঙ্গলবার, ০৩ আগস্ট ২০২১ | প্রিন্ট

মৃতের সৎকার এবং খাঁচায় বন্দি ভালবাসা

মোহাম্মদ জাহির মিয়া তালুকদার

আমরা কঠিন একটা সময় পার করছি । সংবাদ মাধ্যম থেকে যা খবর পাওয়া যায়, আশে পাশের খবর তার চেয়েও নিষ্ঠুর, নিস্তরঙ্গ, অপ্রিয় সত্য । ঘরবন্দি জীবনের ফাঁকে ফাঁকে যখন চাপা কান্নার কলরোল ভেসে আসে চারপাশ থেকে তখন অন্তরচক্ষু প্রসারিত হয়, মনের ভিতরের মন জাগ্রত হয়, চিন্তার বলিরেখা সারা চেহারা আচ্ছন্ন করে ফেলে । সব জায়গায় সব কিছু আছে, আবার কোথাও যেন কিছুই নেই । চরম নির্মমতার খাঁচায় আমাদের আবেগ অনুভুতি বন্দি হয়ে ছটপট করছে। কাছাকাছি থেকেও আবেগ অনুভুতি বির্জন দিয়ে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকার করুণ দৃশ্য যেন পৃথিবীর চরম বাস্তবতারই কৃষ্ণগহ্বর, যা আমাদের চিরাচরিত বন্ধনকে ক্রমেই গ্রাস করে ফেলেছে ।

কোথায় যেন একটা শূন্যতা বিরাজ করছে আমাদের চারপাশে । দমকা হাওয়ার কবলে পড়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গন্তব্যহীন পথে যাত্রা করছি, যার সহযাত্রী একরাশ হতাশা আর চরম মৌনতা । দুঃস্বপ্নের পাহাড় অতিক্রম করা ক্লান্ত-শ্রান্ত পথিকের শরীর থেকে ঘামঝড়া বিপর্যস্ত দৃশ্য আজ আর কাউকে যেন এক বিন্দুও ভাবিয়ে তুলে না । পরপারের দিকে যাত্রা করা মানুষটি কিছুক্ষণ আগে যেখানে অসামন্য দ্যুতি ছড়াচ্ছিল চারপাশে, ভিতরের হাওয়া বের হয়ে যাওয়ার পর যেন আবেগ অনুভুতির সকল দরজা জানালা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় । মৃতের সৎকার করা, তার প্রতি সহানুভুতি দেখানো , শেষ বিদায়ে তাকে সম্মান জানানো, অন্তরের একান্ত জায়গায় তাকে অনুভব করা প্রভৃতি যেন এক ফুৎকারে হাওয়ায় মিলিয়ে কোন বিভুইয়ে চলে গেল তার খবর কেউ রাখেনা ।


চারপাশে আগের মত জনারণ্য তৈরী হয় না আর , কফিনের আশে পাশে যারা ঘুরছেন তারা কেউ সাহসী দর্শনার্থী , কেউ কিছুটা চক্ষু লজ্জ্বার খাতিরে আসা, আর কেউ আছে রক্তের ঋণ পরিশোধ করার তাগিদে ( সংখ্যাটা বড়ই হতাশা ব্যঞ্জক) উপস্থিত হওয়া স্বজন । মূল্যবান দ্রব্যাদি অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করে চাহিদা পুরণ করা যায় । কিন্তু আবেগ-অনুভূতি, শ্রদ্ধা-ভালবাসা এসব অন্তর থেকে উৎপন্ন হয় যা বাজারের সওদার তালিকায় স্থান পায়না, সেটা মানব জীবনের অমূল্য সম্পদ । এই অমূল্য সম্পদ ই মরুভূমির বালুর মত মহামারির দমকা হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে । আর আমরা পরিচিতজন পাশে থেকেও কেন যেন অচেনা অজানা গলির সহযাত্রী হিসেবে নিজেদের আবিষ্কার করছি ।

আমরা সাহসী , আমরা বীরের জাতি । দশ হাত উঁচু ঢেউকে আমার বিশ হাত উচ্চতার লাফ দিয়ে অতিক্রম করা লড়াকু জনগোষ্ঠী । সাহসের ঘাটতি আমাদের কোন দিন ছিল না । বাস্তব অবস্থায় আমরা সবসময় অকুতুভয়, জানা এবং মানাতে আমরা কম গিয়েছি বলে মনে পড়ে না । ১২৯ ডলারের মাথাপিছু আয় আজ ২২২৭ ডলারে এসে কড়া নাড়ছে, আমরা নিম্ন আয়ের দেশ থেকে দ্রুতগতিতে মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছি, বৈদেশিক মুদ্রার বিজার্ভ আমাদের সমৃদ্ধি ও কর্মট জনবলের প্রমাণক । পদ্মা সেতু, উড়াল সেতু, রূপপুর পারমানবিক চুল্লি, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এসব কিছুই আমাদের সক্ষমতার পরিচয় বহন করছে। আরো অনেক গুলো বিষয় আছে যা আমাদের বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। কিন্তু, আমরা কোথায় যেন সচেতনতা বা একটুকরো কাপড়ের মুখোশ পড়তে প্রচন্ড দৈন্যতায় ভোগছি । সরকারি আদেশ পালনে চোর-পুলিশ খেলা খেলছি । আবার, মৃতের সৎকার নিয়ে বিবেক বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে অজ্ঞতাকে পুঁজি করে সামাজিক বন্ধনকে বেমালুম ভুলে যাচ্ছি।


শিক্ষার আলোর ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

প্রতিটা দিন আজকাল মসজিদের মাইক বেজে উঠে সময়ে অসময়ে । মাউথ পিচে ফু দিলেই অজানা আশংকায় বুকের ভিতর হাতুড়ি পেঠা শুরু হয় । আকাশের সমস্ত কালো মেঘ এক নিঃশ্বাসে চারপাশ থেকে ছুটে এসে ঘিরে ধরে ধ্বংসের আয়োজনে ক্রুর হাসি হেসে নগ্ননৃত্য করার জন্য । তারপরও আমরা টং দোকানে জড় হই চায়ের কাপে ঝড় তুলার জন্য, বিড়ির পিছনে সুখ-টান দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে দূরের আকাশ পানে তাকিয়ে মনের অজান্তেই চারপাশের মৃত্যুর মিছিলকে আরো বেশী সমৃদ্ধ করেই যাচ্ছি । রাস্তার পাশের আড্ডা দেয়ার জায়গায় না গেলে যেন আমাদের জীবনটাই বর্বাদ হয়ে যাবে মুহূর্তের মাঝেই! মৃত্যুর নগ্ননৃত্যের মাঝখানে যে আমরা আমাদের আপনজনকে হর হামেশা ঠেলে দিচ্ছি সেটা একবার কল্পনা করছি না ।
নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য উদ্ভটসব যুক্তি আমরা হরহামেসাই দাঁড় করি জনমনে বিভ্রন্তি ছড়াচ্ছি । যারা রোগ সম্পর্কে উপদেশ দেয়ার কথা সেখানে ননপ্রফেশনাল লোক সেদায়িত্ব নিজের মত করে পালন করে আশে পাশের লোজন কে বিভ্রন্ত করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি । একবারও ভাবছি না আসলেই কি করছি আমরা !


শিক্ষার আলোর ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

আমাদের আরো সাহসী যেমন হতে হবে, তেমনি সমানভাবে সচেতনও হতে হবে । সাহসী হতে হবে বেঁচে থাকার জন্য, বাঁচিয়ে রাখার জন্য । জীবন-জীবিকার তাগিদে আমরা নিজেদেরকে যেন অস্তিত্বহীন না করে ফেলি, জীবন যাতে বিপন্ন না হয় আমাদের সেদিকে সচেতন থাকাটাও জরুরী । হাটে-মাঠে যেখানেই যাই শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখাটা যেমন জরুরী, মাস্ক পরিধান করাটা আরো বেশী জরুরী । যিনি আক্রান্ত, তিনি মাস্ক ব্যবহার করে দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করলে অন্যের মধ্যে মহামারি ছড়িয়ে দেয়ার হার অন্তত কমে যাবে বলে বিশেজ্ঞমহল মনে করছেন।

শিক্ষার আলোর ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

সাহস যোগানো একটা বিরাট কাজ । অতিমারির চলমান ধারায় আমরা সাহস হারাতে চাইনা । সাহসের ইতিবাচক ব্যবহার করাটা যেমন জরুরী, তেমনি অজ্ঞতা এবং অন্ধকার থেকে বেড় হয়ে সচেতন হওয়াটাও সমভাবে জরুরী । তারচেয়ে বেশী যা দরকার সেটা হচ্ছে মানবিকতা প্রদর্শন করা, যা মহামারির কবলে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে । আক্রান্ত ব্যক্তির মৃতদেহ যেন সম্মান সহানোভুতি পায় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে । যে ব্যক্তি বেঁচে থাকা অবস্থায় জীবনের অমূল্য সম্পদ স্নেহ ভালবাসা উজার করে দিয়েছেন অন্তত অন্তিমকালে তার প্রতি এতটুকু সম্মান , ভালবাসা, মমতা প্রদর্শ করাটা খুব বেশী দরকার । মানুষ একবারই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে, সেটা মহামারি বা স্বাভাবিক অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করুক তাই মৃত্যুপরবর্তী বিদায়ের সময়টা হোক সম্মানজনক ভালবাসায় পরিপূর্ণ । মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে নিয়ে জনমনে ভয় বা ভীতি না ছড়িয়ে সচেতন করা জরুরী । স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে আপনি যেমন নিরাপদ থাকবেন , তেমনি আপনার আশপাশের লোকজনও নিরাপদ থাকবে । ভাল থাকুন সকলে, ভাল থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ ।

শিক্ষার আলোর ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।
—————————————————————————————————————————————-
লেখক: মোহাম্মদ জাহির মিয়া তালুকদার
           ইন্সট্রাক্টর , উপজেলা রিসোর্স সেন্টার
           বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।

Facebook Comments Box

Posted ৮:২১ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৩ আগস্ট ২০২১

শিক্ষার আলো ডট কম |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  
অফিস

১১৯/২, চৌগাছা, যশোর-৭৪১০

হেল্প লাইনঃ 01644-037791

E-mail: shiksharalo.news@gmail.com