শনিবার ১৫ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সান্ধ্যকালীন আন্দোলন ও শিক্ষার চলমান সিঁড়ি

মোহাম্মদ জাহির মিয়া তালুকদার   |   বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১ | প্রিন্ট

সান্ধ্যকালীন আন্দোলন ও শিক্ষার চলমান সিঁড়ি

মোহাম্মদ জাহির মিয়া তালুকদার

-প্রতিনিধি

২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস । চাকুরীতে যোগদান করেছি প্রায় দুইমাস হলো । প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে হবে সেটা জানি, তবে কী কাজ করতে হবে সেটা আস্তে আস্তে হয়তো বুঝতে পারব । অফিস নিয়মিত করি । নিয়মিতভাবে বেশীর ভাগ প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলো পরির্দশন করছি । যখন অবসর পাই মনের ভিতরে স্কুল লাইফের কথা বিদ্যুৎ চমকের মত ঝলসে ওঠে, আবার ব্যস্ততার চাপে ক্ষণিকের জন্য নিভে যায় । মনে পড়ে যায় বিবিয়ানার পশ্চিম পারে পাশের গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আসা যাওয়ার স্মৃতি ।

বিবিয়ানা নদী পার হয়ে আমড়াখাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিদিন যেতাম । তখনো আমাদের গ্রামের বিদ্যালয়টি ততটুকু শক্তপুক্ত অবস্থায় দাঁড়াতে পারেনি । একবার বাঁশ টিন দিয়ে নির্মাণ করা হয় । মাতাল ঝড়ের তান্ডবে বাঁশ-টিন উড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে দিগ-দিগন্তে । সেই ফাঁকে আমাদের পড়া-লেখার চাকাটা সচল রাখতে আমার পিতার ইচ্ছায় পাশের গ্রামের বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করতে থাকি । হেমন্তে নায়ে আর বর্ষায় পায়ে চলাচল করাটাই ছিল আমাদের পুরো এলাকার যাতায়াতের মূল চিত্র । এখন যদিও সে অবস্থা আর নাই ।


বর্ষাকাল আসলেই পুরো রাস্তাঘাট পানিতে সয়লাব হয়ে যেত । বর্ষার আগমনের সাথে সাথেই বিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার পাঠ চুকে গেল । ইতোমধ্যে গ্রামের সবাই মিলে বিদ্যালয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে সফল হলেন । আমার বাবা ছিলেন এ পথের সামনের সারির সৈনিক । আমাদের লেখাপড়া করার সুযোগটা একেবারে হাতের মুঠোয় চলে আসল । ইকরের (অনেকে আড়া ও বলে থাকেন যা একধরনের ঘাস বা ছন জাতীয় উদ্ভিদ) বেড়া আর টিনের চালের নীচে আমার প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেষ হলো । ইট সুরকির দেখা মেলে আরো প্রায় এক দশক পর ।

কী করুন চিত্র ছিল গ্রামের বিদ্যালয়ের । টিন-বাঁশের দুর্বল কাঁচা ঘর ভবন, শিক্ষকের বেতন দিতে হত চাঁদা তুলে, কোন কোন সময় একজন বা দুইজন শিক্ষক পাওয়া যায় এর পরই আবার একজন কখন কোথায় যেন চলে যান যা আমাদের চিন্তার বাইরেই ছিল । পরে যখন এর ইতিহাস জেনেছি তখন সত্যি ঘটনাটা আমার ভেতরে খুব বেশী নাড়া দিত । আর যাই হোক, শিক্ষককের পরিবার পরিজনের কথা তো অন্তত ভাবতেই হয় । বর্ষায় আমাদের বিদ্যালয়টি একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো । দুর থেকে দেখলে অনেকটা দ্বীপের মতই মনে হতো ।


বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে নিজ গ্রামের বিদ্যালয়টির উন্নয়ন নিয়ে ভিতর থেকে একটা তাড়া অনুভব করছিলাম । বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা পঞ্চাশ এর কোটাও পার হয়নি । প্রতি সপ্তাহে বাড়ি যাওয়াটা একটা রুটিন কাজ ছিল । মাথার মধ্যে একটা বিষয় সবসময় ঘুরপাক খেতে থাকলো । গ্রামের লোক সংখ্যা দুই আড়াই হাজার হলেও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা পঞ্চাশ জন হয় কী করে ।

মুরব্বিয়ান-যুবক সকলের সাথে ব্যক্তিগতভাবে মত বিনিময় করা শুরু হলো । কাজ করার সবচেয়ে বড় শক্তি- যুবকদের সংগঠিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলো । প্রায় পাঁচ সাতটা সভা করার পর শুরু হল অভিযান । সন্ধ্যার পর যুবকদের নিয়ে প্রতিটা ঘরে গিয়ে উপস্থিত হয়ে ছেলে-মেয়ে কে বিদ্যালয়ে পাঠানোর দাওয়াত দেয়া শুরু হলো । কোন লোকই আপত্তি করেনি বরং সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন । দু’-একজন অভিভাবক শিক্ষক সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করতে থাকলেন ।


– আপনি কি কখনো বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেছেন আপনার ছেলে মেয়ে আসলেই ঠিকমত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না?
– অথবা, শিশুরা বাড়িতে অন্তত দু’বেলা পড়তে বসে কি না? এভাবে পাল্টা প্রশ্ন করতে থাকি ।
উত্তর দেয়ার কোন কিছুই আর তারা খুঁজে পায়নি । তারা কাল থেকে বিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়েকে পাঠানোর জন্য সবাই এক বাক্যে রাজি হলেন । যদিও অনেক ছেলে-মেয়ে মা-বাবা কে কাজে সাহায্য করে, কিংবা এদিক ওদিক অযথা ঘুরে বেড়ায় । ওসব বাদ দিয়ে এবার তারা বিদ্যালয়-মুখি হবে । শুধু মাত্র একজন লোক বলেছিলেন যে, তিনি তার ছেলেকে বিদ্যালয়ে পাঠাবেন না । ঠিক সেখানেই আমাদের আধা ঘন্টার মত সময় ব্যয় করে লোকটাকে রাজি করতে সক্ষম হই ।

পরের দিন সকাল বেলা দেখা গেল প্রায় দুইশ’ এর মত শিক্ষার্থী চোখে মুখে নতুন স্বপ্নের ছাপ নিয়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়েছে । এক একজন শিক্ষার্থী যেন এক একটা মহাকাব্যের মতো । সামনের দিন গুলোতে তার শিক্ষার চলমান সিঁড়িতে পা রাখতে চায় ।নিজেদের শির উন্নত করে পুরো বাংলাদেশটাকেই মাথা উঁচু করে সম্মানজনক জায়গায় পৌঁছে দিতে চায় । মনের আনন্দে ভেতরটা সেদিন নেচে উঠলো , এটা ছিল আমাদের কাজের প্রথম সাফল্য । কিন্তু, যারা কর্মরত ছিলেন তাদের মনের কোণে যেন কালো মেঘের মত আঁধার জমাট বেঁধে বসে আছে । পঞ্চাশের জায়গায় দুইশ’, প্রায় চারগুণ! তারা সেটা ভাবতেই পারেন নি । এটা আমাদের সান্ধ্যকালীন আন্দোলনেরই প্রতিফলন ছিল ।

এতগুলো শিক্ষার্থীর বই-খাতার ব্যবস্থা করতে স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়াম্যানকে কাজে লাগিয়ে একটা ট্রলারঘাট উনার মাধ্যমে ইজারা প্রদান করে টাকা যোগাড় করলাম । সে টাকা দিয়ে বই কিনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই খাতা বিতরণ করা হলো । শিক্ষক সংকট দেখা দিলে প্যারা শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় । স্থানীয়ভাবে অর্থ সংগ্রহ করে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো । শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য সবাই উজ্জীবিত হয়ে কাজ করতে থাকলো । যুবকদের একটা টীম করে দেয়া হলো যারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করত, যাতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতিটা ঠিকঠাক মত হয় । তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য সমস্যা হলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া ।

বর্ষাকালে জনবিচ্ছিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারাপারের জন্য ছোট্ট একটা ডিঙ্গি নৌকা কিনে দেয়া হলো । শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে পারাপার করে দেয়ার জন্য একজনকে দায়িত্ব দেয়া হল নৌকা ব্যবহার করে গরুর ঘাস কাটতে পারার বিনিময়ে । চুক্তি মোতাবেক প্রতিদিন সে লোক নৌকা দিয়ে বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক পারাপার করতে থাকেন ।

আচমকা বানের জলে বিদ্যালয়ের অবস্থা তখন খুব খারাপ পর্যায়ে চলে গেল । পুরো বিদ্যালয় বানের জলের নীচে তলিয়ে গেল । বানের পানি সরে গেলে আবারো নতুন উদ্যমে আন্দোলন শুরু হল ।বেশ কয়েক বছর পর, ঈদের ছুটিতে গ্রামের প্রতিটি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো শুরু করলাম । একটা বাড়ির ঘরের ভেতরে ঢুকতেই আমরা অবাক হয়ে যাই । টেবিল ভরা পাঠ্যবই । নিয়মিত পাঠাভ্যাসের কাজ চলে সেটা দেখেই বুঝা যায় । ঘরে ভিতরে পরিবেশ কেমন মার্জিত, মনোরম ও যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন । তখন মনে পড়লো, সান্ধ্যকালীন অভিযানে এখানেও এসে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী পাঠানোর দাওয়াত দেয়া হয়েছিল । যে পরিবারের মেয়েটি লেখা পড়া ছেড়ে গৃহস্থালির কাজে যোগ দিয়েছিল, সে মেয়েটি পরের বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দিবে । ভাবতেই যেন ভাল লাগছে ।

মনে হলো খুব বেশী না হোক, অন্তত একটি পরিবারের একটি মাত্র শিশুকেও যদি বিদ্যালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যায়, তাকে শিক্ষার চলমান সিঁড়িতে পা রাখার সুযোগ করে দেয়া যায়, তাহলে সে অন্তত কিছুটা হলেও এগিয়ে যাবে, পরিবারটা আলোর দেখা পাবে । অন্তত একটা প্রজন্ম এগিয়ে গেলেও তো সেটা কম কিছু নয় ।

উৎসাহ এবং উদ্দীপনার যেন কোন কমতি ছিল না । স্বপ্ন দেখতে পারলে এবং দেখাতে পারলে কোন না কোন সময় এর সফল বাস্তবায়ন ঘটবেই । পৃথিবী যখন আপন গতিতে চলছিল , চাঁদ যখন তার দ্যোতি ছড়াচ্ছিল চার দিকে । সূর্য আপন মনে আলোকিত করে রাখছিল সারা পৃথিবী । গ্রামের সবুজ গাছ-পালা তর তর করে বেড়ে উঠছিল । তখন হঠাৎ ধমকা হাওয়ার সাথে আকাশের চারদিক যেন কালো মেঘে ছেয়ে গেল । চারদিকে একটা করুণ সুর বেজে উঠলো । দমকা হাওয়া এলে ও বিদ্যালয়ের চালা বা বেড়া আর আগের মত উড়িয়ে নিতে পারলো না । ভবনের পরতে পরতে সমৃদ্ধি আর জৌলুস টিকরে পড়ছিল । কিন্তু, একটি পরিবারের পুরো সুখ-শান্তি দমকা হাওয়ায় লন্ড-ভন্ড হয়ে গেল । আমাদের সান্ধ্যকালীন আন্দোলনের ফসল সেই মেয়েটি পরীক্ষার আসন গ্রহণ করার আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেল পরপারে, যেখান থেকে কেউ কোন দিন ফিরে আসেনা ।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় মনে হলো নতুন প্রজন্মের মধ্যে আমাদের সেই সান্ধ্যকালীন আন্দোলনের সফলতার ছুঁয়াটুকু আজ-কাল কিছুটা টের পাই । মাঝে মাঝে মনে হয় বীজ বুনলেও ফল পেতে অন্তত কিছুটা দিন তো অপেক্ষা করতেই হয় । অপেক্ষার ফল সত্যি মধুর হয় ।

প্রায় দুই দশক পর, দেশের প্রায় সবগুলো বিদ্যালয়ের চেহারা আমুল পরিবর্তন হয়েছে । জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে । সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয় গুলোতে আলো ছড়িয়ে দেয়ার মত শিক্ষক এবং শিখন সামগ্রীর অপ্রতুলতা আর চোখে পড়ার কথা নয় । তাই, মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারে সান্ধ্যকালীন আন্দোলন অথবা এর আদলে অন্য যে কোন আন্দোলন চালু রাখতে পারলে প্রাথমিক শিক্ষা আরো বেশী সমৃদ্ধ হবে, সহজেই ঝরে পড়া রোধ করা যাবে । শিক্ষার চলমান সিঁড়িতে চড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে মানসম্মত শিক্ষার উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়া এখন সময়ের দাবী ।

লেখক: মোহাম্মদ জাহির মিয়া তালুকদার
ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা রিসোর্স সেন্টার, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ ।

শিক্ষার আলোর ফেসবুক পেজে লাইক দিন ও ফলো করুন (ক্লিক করুন)।

শিক্ষার আলোর ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন।

Facebook Comments Box

Posted ৭:১৯ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১

শিক্ষার আলো ডট কম |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
অফিস

১১৯/২, চৌগাছা, যশোর-৭৪১০

হেল্প লাইনঃ 01644-037791

E-mail: shiksharalo.news@gmail.com